চীনের রফতানি নিয়ন্ত্রণের কারণে দুষ্প্রাপ্য খনিজ সরবরাহ চেইনে তৈরি হয়েছে ঘাটতি। এ পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলোর চুম্বক বা ম্যাগনেট ও দুষ্প্রাপ্য খনিজ সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনায় নেমেছে ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারা। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বিকল্প উৎস নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। খবর এফটি।
গাড়ি নির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ দুষ্প্রাপ্য খনিজ। সাধারণত বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির মোটরের পার্মানেন্ট ম্যাগনেটসহ অন্যান্য উপাদানে এটি ব্যবহার হয়। চীন হলো এ দুষ্প্রাপ্য খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতের প্রধান বৈশ্বিক উৎস। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক বিবাদের আবহে চীন এপ্রিলে এসব উপকরণের রফতানি নিয়ন্ত্রণ আরো কঠোর করেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক রেইনবো রেয়ার আর্থস নামের একটি কোম্পানির সঙ্গে সম্প্রতি আলোচনায় বসেছে জার্মান গাড়ি কোম্পানি মার্সিডিজ-বেঞ্জ। তারা ভবিষ্যতে দক্ষিণ আফ্রিকার একটি খনি থেকে খনিজ সংগ্রহ করতে চায় বলে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন।
মার্কিন সরকারের আংশিক মালিকানাধীন টেকমেটের সহযোগী সংস্থা রেইনবো। ২০২৭ সালে খনিজ উত্তোলন শুরু করতে পারে রেইনবো, যা পার্মানেন্ট ম্যাগনেট তৈরিতে ব্যবহার হবে।
বিষয়টি নিয়ে মার্সিডিজ মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও রেইনবো বলছে, তারা গাড়ি নির্মাতা ও বৈশ্বিক ট্রেডিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আগাম ক্রয়াদেশ চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে জার্মান চুম্বক নির্মাতা ম্যাগনোস্ফিয়ারের প্রধান নির্বাহী ফ্র্যাংক অ্যাকার্ড জানান, ম্যাগনেটের অতিরিক্ত সরবরাহ চাইছে পোরশে ও অন্য গাড়ি নির্মাতারা। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ পরিস্থিতি এড়াতে কোম্পানিগুলো তৎপরতা বাড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সবাই একযোগে ফোন করে বলছে, “আমাদের দুই হাজার ম্যাগনেট দিতে পারো? না হলে উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যাবে। দাম কোনো সমস্যা না—আপনি কী করতে পারবেন, কবে দিতে পারবেন, সেটা বলুন।” এটা একেবারে অবিশ্বাস্য পরিস্থিতি।’
ফ্র্যাংক অ্যাকার্ডের মতে, জুলাইয়ের মাঝামাঝির মধ্যে যদি বিকল্প উৎস না পাওয়া যায়, তবে গাড়ি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
দুষ্প্রাপ্য খনিজের এ ঘাটতি শুধু ইউরোপে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ড গত মাসে তাদের শিকাগো স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিকল (এসইউভি) কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছিল। কারণ কারখানায় ম্যাগনেটের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল।
অনেক কোম্পানি এখন ম্যাগনোস্ফিয়ারের কাছে জানতে চাইছে তারা চীনা উপকরণ ছাড়াই ম্যাগনেট তৈরি করতে পারবে কিনা। কোম্পানিটি বর্তমানে চীনা দুষ্প্রাপ্য খনিজের ওপর নির্ভরশীল।
জার্মান বিনিয়োগ ব্যাংক বেরেনবার্গের বিশ্লেষকরা গত সপ্তাহে বলেছিলেন, চলমান ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চীনের বাইরের সরবরাহ চেইন তৈরিতে বিনিয়োগ গতিশীল হবে। এতে রেইনবোর মতো কোম্পানিগুলো লাভবান হবে।
সম্প্রতি একাধিক গাড়ি নির্মাতারা বারবার সতর্ক করেছেন, তাদের কাছে থাকা দুষ্প্রাপ্য খনিজ চুম্বকের মজুদ কয়েক সপ্তাহ থেকে সর্বোচ্চ কয়েক মাসের জন্যই যথেষ্ট।
এ সংকটে একমাত্র ব্যতিক্রম হলো হুন্দাই। দক্ষিণ কোরিয়ার এ গাড়ি নির্মাতা ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান কিয়া জানিয়েছে, তাদের মজুদে থাকা দুষ্প্রাপ্য খনিজ চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত চলবে।
ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো চীনের বাইরের উৎস থেকে খনিজ পেলেও এখনো বিশ্বের অধিকাংশ ম্যাগনেট উৎপাদন হয় এশিয়ায়। এক কোম্পানি নির্বাহী বলেন, ‘যতক্ষণ না ইউরোপ পার্মানেন্ট ম্যাগনেট উৎপাদনে মনোযোগ দেয়, ততক্ষণ এ সমস্যার সমাধান হবে না।’
বেইজিং সম্প্রতি কিছু ইউরোপীয় কোম্পানির জন্য দুষ্প্রাপ্য খনিজ রফতানি লাইসেন্স দ্রুত অনুমোদনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে অনেক কোম্পানি লাইসেন্স পেলেও চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পেতে এখনো বিলম্ব হচ্ছে। লাইসেন্স আবেদনের জটের কারণে রফতানিতে বিলম্ব হতে পারে। ভক্সওয়াগনের মতো যেসব কোম্পানি এরই মধ্যে চীনা লাইসেন্স পেয়েছে তারাও বলছে, পণ্য আসতে সপ্তাহ বা মাস লাগতে পারে।